Skip to content

Back to Muses
essayবাংলা

Mural and Spotify


আমরা যারা একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান নিয়েছিলাম, কম বেশি সবাই জয়েন্ট এনট্রেন্সের প্রস্তুতি নিয়েছি। আর আমার মতন সাধারণ মধ্য মেধার ছাত্র ছাত্রীদের কাছে আইআইটি কিংবা ডাক্তারিতে চান্স পাওয়াটা ছিল যেন এক স্বপ্নের মতন।

ইচ্ছা যা জলের চেয়েও স্বচ্ছ, আর তাকে হাসিল করা যেন হিমশীতল হিমালয় আরোহণের চেয়েও কঠিন। ভেবে দেখতে গেলে, আমরা কম বেশি সবাই কোনো না কোনো পর্যায়ে self-doubt এ ভুগেছি। "আমার দ্বারা কি আদৌ জয়েন্ট হবে? আমি কি আদৌ চান্স পাব?" অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা কম বেশি সবাইকেই একসময় গ্রাস করেছে।


নরেন্দ্রপুর থেকে যেবার আমাদের সকলকে শান্তিনিকেতন ঘুরতে নিয়ে গেলো, অর্থাৎ যেই সালে কোটা ফ্যাক্টরি ওয়েব সিরিজটা রিলিজ হলো, সেবারে আমি আর সায়ন্তন শান্তিনিকেতনে রবি ঠাকুরের ধ্যান কক্ষের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে প্রার্থনা করেছিলাম যেন দুজনেই আইআইটি পাই, এক সাথেই এক কলেজে পড়তে পারি। দুজনে শপথ নিয়েছিলাম আইআইটি না পাওয়া অবধি কোটা ফ্যাক্টরি দেখবো না। একসাথে আইআইটি পেয়ে, এক হোস্টেলের রুমে একসাথে বসে দেখব কোটা ফ্যাক্টরি।

দীর্ঘ মেয়াদী লোকডাউনের কারণে জয়েন্ট পিছিয়ে যায়।


ঠাকুমার বাড়িতে কিছুদিন যাবত প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল। একদিন পড়তে পড়তে হঠাৎই কি মনে হওয়ায়, ঠাকুমার ঘরের দেওয়ালে পেন দিয়ে বড় বড় করে লিখেছিলাম দিদির আর আমার নাম —

ঠিক এভাবে
মানসী - aiims
মানস -

আমার নামের পাশে ফাঁকা রেখেছিলাম, ভেবেছিলাম আইআইটি পেলে জায়গাটা ভরাট করব।


বলা বাহুল্য, সেসময় এক সহপাঠী বান্ধবীকে ভালবাসতাম। করোনা মহামারী এবং সেই সময়ের অনিশ্চিত দিনগুলোয় একে অপরকে অনেকটা সাহস আর মনের জোর যোগাতাম। আমার মনের জোর আমাকে বলেছিল, খুব বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতে যদি একান্তই আইআইটিতে চান্স না পাই আমি, আমরা একে অপরের মনের জোর হয়ে একসাথে থাকবো।


পরবর্তীতে যাদবপুরে ভর্তি হয়ে বাকি সবার মতনই নিজেকে ইঁদুর দৌড়ে সামিল করলাম। গান গাওয়া, ছবি তোলার নেশা সব জলাঞ্জলি দিয়ে প্লেসমেন্টের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিলাম। সবার মুখে খুব শুনতাম, ব্যাঙ্গালোর শহরে নাকি ভীষণ গাড়ি ঘোড়ার জ্যাম হয়। জ্যামের অস্থিরতায় নাকি গোটা শহরে নাজেহাল অবস্থা।

ব্যাঙ্গালোর, অর্থাৎ আমাদের দেশের সফটওয়ার ক্যাপিটাল, কলেজ শেষে যা কিনা আমার অন্যতম গন্তব্য। কলেজে উঠে কোড করার সময় খুব গান শুনতে ভালো লাগতো। স্পটিফাই সাবস্ক্রিপশন নিয়েছিলাম শুধু গান শুনবো বলে।


পরবর্তী কলেজ-জীবনে যাকে ভালবেসেছিলাম, তার ভারী ইচ্ছে ছিল এক মস্ত বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করার। আমার অবশ্য কোনোদিনও কোনো ড্রিম কোম্পানি ছিল না। শুধু কোড করতাম আর গান শুনতাম। তবুও কেন জানি না নির্বোধের মতন আমার সব ভালোলাগার গানগুলো নিয়ে একটা প্লেলিস্ট বানিয়েছিলাম স্পটিফাইতে। ইচ্ছে ছিল, যদি সব ঠিক থাকে, কোনোদিন ব্যাঙ্গালোরের কোনো ভিড় বাসে বা জ্যামে কখনও গান শুনবো একসাথে।


আসলে বড় হওয়া ব্যাপারটাই খুব কঠিন। জীবনে যখন যেমনটি ভেবেছিলাম তা কিছুই হয়নি। সায়ন্তন আইআইটি পেলো, আমি পাইনি। আমার প্রথম প্রতিশ্রুতি, একে অপরের পাশে থাকা — সেসবও হয়ে ওঠেনি পরবর্তীতে। আমার ব্যাঙ্গালোরে চাকরি হয়নি। সে তার ড্রিম কোম্পানিতে সুযোগ পায়। আর আমি? সেই সবসময়ের মতন ব্যর্থ।

রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছিলেন - চাইলাম জামা, পাইলাম মোজা, মোজা দিয়েই জামার কাজ চালানোর চেষ্টা করছি।

অগত্যা, হ্যাঁ আমি আজও কোটা ফ্যাক্টরি দেখিনি। ঠাকুমার ঘরের দেওয়ালে সেই দিদির আর আমার নাম লেখা, আমার নামের পাশে আজও ফাঁকা পড়ে রয়েছে। আর অচিরেই হারিয়ে গেছে স্পটিফাই এর সেই প্লেলিস্ট।

মানস
৬ জুলাই, ২০২৪